. .
.

বুলেট ও রক্তের ঐতিহাসিক চরিত্র

রিপোর্টারের নাম: ফুলতলা প্রতিদিন
  • সংবাদ প্রকাশের তারিখ : Dec 14, 2025 ইং
  • ৭৮১ বার
ছবির ক্যাপশন:

বুলেট ও রক্তের ঐতিহাসিক চরিত্র


✑ মোঃ ওলিউল্লাহ 

ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মানবসভ্যতার গতিপথ নির্ধারণে বুলেট ও রক্তের ভূমিকা ছিল, কিন্তু অতীত ও বর্তমান—কোনো সমাজই কখনো এ ধরনের সহিংসতাকে উৎসাহিত করেনি। প্রাচীন যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত মানবসভ্যতা নানা রকম অস্ত্রের ব্যবহার দেখেছে, কিন্তু নিজের জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং শত্রুর বিরুদ্ধে এ অস্ত্র ব্যবহারের কথা বলা হতো। স্বাধীন দেশ হিসেবে গত চৌান্ন বছরে বাংলাদেশ তার ইতিহাসে বারবার রক্তাক্ত অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে—সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতনসহ—শাসন পরিবর্তনে বুলেট ও রক্তই প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিবারই বাংলাদেশের মানুষ হয়েছে বুলেট ও রক্তের শিকার।
বাংলাদেশের মানুষকে আর কত দিন বুলেট ও রক্তের শিকার হতে হবে—এ প্রশ্ন আজ সকল সচেতন মানুষের মনে। দেশবাসী আন্তরিকভাবে চায়—বাংলাদেশের রাজনীতিতে বুলেট ও রক্তের খেলা যেন একেবারে চিরতরে বন্ধ হয়।

বাংলাদেশের জন্মই হয়েছে এক রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে—১৯৭১ সালের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে কয়েক মিলিয়ন মানুষ প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু শান্তি ও স্বাধীনতার ভোর সেই প্রত্যাশার কাছাকাছি কখনোই পৌঁছাতে পারেনি।

শেখ মুজিব সরকার নিজের জনগণের রক্ত ঝরাতে দ্বিধা করেনি—ঠিক সেই গণতন্ত্রের নামে, যার জন্য তিনি সারাজীবন লড়াই করেছেন। আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ (মস্কো) ছাড়া সমাজের বাকি সবাই, তাদের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, নতুন বুলেটের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। সমাজের প্রকৃত মুসলমানদেরও ‘বিরোধী শক্তি’ হিসেবে ব্র্যান্ড করা হয়, এবং স্বাধীনতার প্রারম্ভিক ভোরেই উর্দুভাষী বিহারি জনগোষ্ঠীসহ কয়েক মিলিয়ন মানুষ নির্মমভাবে নিহত হয়।

সমাজে ইসলামের ভূমিকা আগ্রাসীভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়ে, বিপরীতে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়। সেক্যুলারিজম সমাজে প্রাধান্য লাভ করে এবং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ব্যাপকভাবে অবহেলিত হয়।

শেখ মুজিব স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা তার একসময়কার সহযোদ্ধাদের রক্ত ঝরাতেও দ্বিধা করেননি। নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাসদ-এর অনুসারী কয়েক হাজার কর্মীকে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জে.আর.বি.—দেশের নতুন প্যারামিলিটারি বাহিনীর—বুলেটে নির্বিচারে হত্যা করা হয়।

প্রতিপক্ষকে নির্মূল করে শেখ মুজিবের ব্যক্তিশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার ফলে খন্দকার মোস্তাকসহ দৃঢ় গণতন্ত্রবিশ্বাসী অনেক সহচর নেতা তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বুলেট শেখ মুজিব ও তার পরিবারকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট—তার একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটাতে।
এটি নিঃসন্দেহে এক দুঃখজনক সমাপ্তি, কিন্তু তরুণ মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের একটি গোপন অভিযানের মাধ্যমেই তা ঘটে। বাংলাদেশের জনগণ এই পরিবর্তনকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়। যদিও ২০০৮ সালে ক্ষমতায় ফিরে শেখ মুজিবের কন্যা আগস্ট ১৯৭৫-এর বেশিরভাগ সেনা কর্মকর্তাকে ফাঁসিতে দেন।

পরে বুলেট আবার মোড় নেয়—৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এ খুব সামান্য রক্তপাতেই খন্দকার মোস্তাক সরকারের পতন ঘটে। কিন্তু শিগগিরই খালেদ মোশাররফের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় পরিস্থিতি, এবং ৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এ সেনা সদস্যদের ক্ষোভ তার ও তার সহযোগীদের প্রাণ কাড়ে। দেশপ্রেমিক সৈনিকদের সঙ্গে জনসাধারণের সহায়তায় খালেদ মোশাররফের রাজনৈতিক অরাজকতার অবসান ঘটে।

১৯৭৭ সালে কিছু সৈন্য অফিসারদের হত্যা শুরু করলে জিয়াউর রহমান পরিস্থিতি শান্ত রাখতে বাধ্য হয়ে বুলেট ব্যবহার করেন। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে তিনি জেনারেল মঞ্জুরের বুলেটের শিকার হন—যখন তিনি ভারতীয় প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বুলেট থেকে ১৯৭১ সালে, এবং জেনারেল খালেদ মোশাররফের বুলেট থেকে ১৯৭৫-এ বাঁচলেও ভারতীয় প্রভাবের মাধ্যমে সৃষ্ট ষড়যন্ত্র থেকে তিনি রক্ষা পাননি—এভাবে জাতি হারায় এক মহান নেতাকে। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত বুলেট বেশ শান্তই ছিল।

এরপর আবার সক্রিয় হয়—২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক বিডিআর বিদ্রোহে সেনাবাহিনীর ৫৭ জন শীর্ষ কর্মকর্তার রক্ত ঝরে। জেনারেল এ.এল.এম. ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন এ হত্যাযজ্ঞের বাস্তব কারণ উদঘাটন করে—এটি ছিল শেখ হাসিনা ও র'–এর যৌথ অপারেশন।

রক্তপিপাসু হাসিনা ২০১৩ সালের ৫ মে রাতের অন্ধকারে মতিঝিলে জড়ো হওয়া দেশের আলেম-উলামাদের ওপর গুলি চালিয়ে কয়েক শ মানুষ হত্যা করেন। গত পনেরো বছর ধরে যেকোনো বিরোধী কণ্ঠ নির্মূল করতেও তিনি বুলেট ব্যবহার করেছেন।

২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট বিপ্লবেও শিশু, প্রবীণ ও ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। কয়েক হাজার প্রাণের বিনিময়ে দেশ পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়। ভবিষ্যতে আর যেন নিজের জনগণের ওপর বুলেট ব্যবহার না হয়—এটাই জাতির প্রত্যাশা। তা সম্ভব হবে কেবল তখনই, যখন দেশের রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার পরিবর্তনের বিষয়ে একমত হবে।

সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনার একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কোনো সরকারেরই বুলেটকে আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। নিজের জনগণের ওপর বুলেট চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক, এবং সর্বতোভাবে তা এড়ানো উচিত। পাকিস্তান নিজের জনগণের ওপর বুলেট চালিয়ে তার ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করেছে—ইয়াহিয়া খানের নির্বুদ্ধিতায় দেশ ভেঙে যায়।

আমরা সৌভাগ্যবান যে আমাদের সেনাবাহিনীর জেনারেলরা অপ্রয়োজনীয় রক্তপাত এড়াতে যথেষ্ট প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। এখন দায়িত্ব রাজনৈতিক দলের—জ্ঞান ও পরিপক্বতার সঙ্গে আচরণ করার।

গণতান্ত্রিক চর্চাই কেবল শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের নিশ্চয়তা দিতে পারে—বুলেট নয়। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এ সত্য উপলব্ধি করবে এবং সে অনুযায়ী আচরণ করবে—এটাই কাম্য। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে সরকার হোক বা কোনো জেনারেল—কেউই জনগণের রক্ত ঝরানোর সাহস না পায়।
ভোট—এবং কেবলই ভোট—হবে ভবিষ্যতে ক্ষমতা পরিবর্তনের একমাত্র উপায়।

.
কমেন্ট বক্স

নিউজটি শেয়ার করুন..

এ জাতীয় আরো খবর..
.
--
--