. .
.

মুক্তিযুদ্ধের বিজয় কার, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কার?

রিপোর্টারের নাম: ফুলতলা প্রতিদিন
  • সংবাদ প্রকাশের তারিখ : Dec 16, 2025 ইং
  • ৭৮১ বার
ছবির ক্যাপশন: প্রতীকী ছবি

মুক্তিযুদ্ধের বিজয় কার, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কার?


বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মূলত এ দেশের মানুষেরই যুদ্ধ। নয় মাসের দীর্ঘ সংগ্রামে মুক্তিবাহিনী ও সাধারণ জনগণের ত্যাগে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুদ্ধের শেষ প্রায় ১২ দিনে ভারত সরাসরি সামরিকভাবে যুক্ত হয়। এর আগেই মুক্তিবাহিনী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফ্রন্টলাইনের বড় অংশ দুর্বল করে ফেলে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে যায়। অনেক সামরিক বিশ্লেষকের মতে, এই পর্যায়ে ভারত বিমান হামলা ও স্থলবাহিনী মোতায়েন করে যুদ্ধের সমাপ্তি দ্রুততর করে। ফলে বিজয় অর্জনে সময় কমে আসে, তবে যুদ্ধের মূল ভিত ততদিনে ভেঙে পড়েছিল—এই বাস্তবতাটি ইতিহাসচর্চায় গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর অনুপস্থিতিতে কেন আত্মসমর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো? কেন এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে একজন ভারতীয় জেনারেল প্রধান ভূমিকায় থাকলেন? এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে মুক্তিযুদ্ধকে ‘পাক-ভারত যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপনের একটি আইনি ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়—যা আজও আলোচনার বিষয়। এসব প্রশ্ন তোলা মানেই মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার করা নয়; বরং ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ ও বহুমাত্রিক পাঠের প্রয়োজনীয়তার কথাই নির্দেশ করে।

এ কথা সত্য, পাকিস্তানি শাসন ছিল বৈষম্যমূলক ও দমনমূলক। সেখান থেকে মুক্তি ছিল সময়ের দাবি। তবে স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর এসে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—আমরা কি কেবল একটি বলয় থেকে বের হয়ে অন্য একটি বলয়ে অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়িনি? সমালোচকদের একাংশ মনে করেন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমশ ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। সংস্কৃতি ও বিনোদন জগতে ভারতীয় কনটেন্টের প্রভাব, গণমাধ্যমে আধিপত্য, চিকিৎসা খাতে ব্যাপক ভারতমুখী নির্ভরতা এবং নীতিনির্ধারণে আঞ্চলিক প্রভাব—এসব বিষয় আজ আর উপেক্ষার নয়।

বাংলাদেশে দক্ষ ও মেধাবী চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্যখাত নিয়ে জনআস্থার সংকট তৈরি হওয়া, প্রশাসন ও দাপ্তরিক কাঠামোতে রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগ, এমনকি নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন—সবকিছু মিলিয়ে একটি আত্মসমালোচনার জায়গা তৈরি হয়। এগুলো কোনো রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য নয়; বরং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মনির্ভরতা ও সিদ্ধান্তগত স্বাধীনতার প্রশ্ন।

রাজনীতি, প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামোতে বিদেশি প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তির সম্পর্ক, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রভাব—এসব বিষয় গণতান্ত্রিক সমাজে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। এখানে বিষয়টি শত্রুতা নয়, বরং স্বার্থের ভারসাম্য। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য আত্মনির্ভরতা কেবল অর্থনীতিতে নয়—চিন্তায়, সংস্কৃতিতে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণেও জরুরি।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্ব, আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। সেই ইতিহাসকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রেখে নয়, বরং গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেই আমরা ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করতে পারি। ইতিহাস চর্চা মানে অতীতকে অস্বীকার করা নয়—বরং সত্যের আরও কাছাকাছি যাওয়ার সাহস রাখা। স্বাধীনতার প্রথম পর্ব আমরা অতিক্রম করেছি। এখন প্রশ্ন—দ্বিতীয় পর্বে আমরা কতটা আত্মনির্ভর ও প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হতে পেরেছি?

মোঃ ওলিউল্লাহ
আইসিটি বিষয়ক সম্পাদক, দৈনিক ফুলতলা প্রতিদিন

প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক
ফুলতলা-খানজাহান আলী মডেল প্রেস ক্লাব 

.
কমেন্ট বক্স

নিউজটি শেয়ার করুন..

এ জাতীয় আরো খবর..
.
--
--